
তাপস কুমার ঘোষ
সাতক্ষীরার কালিগঞ্জে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে দশম শ্রেণির এক ছাত্রীর বাল্যবিয়েতে ৩২ সহপাঠী অংশ নেওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আইন ও সরকারি নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিষয়টি জানার পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে শেষ পর্যন্ত উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিয়ের আয়োজন বন্ধ করা হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ৩২ জন ছাত্রী তাদের এক সহপাঠীর বিয়ের অনুষ্ঠানে যায়। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়েই তারা সেখানে যায় বলে জানা গেছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসন বাল্যবিয়ের আয়োজনের বিষয়টি জানতে পারে। পরে দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে বিয়ের আয়োজনের সত্যতা পাওয়া যায়। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত বিয়ের আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বিষয়টি নিয়ে রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দীনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ছাত্রীরা বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছে। বিয়েতে অংশ নেওয়া কিশোরী তাদের বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী বলেও তিনি স্বীকার করেন।
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধান শিক্ষক বলেন, না আমরা কোনো পদক্ষেপ নিইনি।তবে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বিয়েতে কোনো সহযোগিতা বা সম্মতি ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুজন ছাত্রী বিদ্যালয়ে এসে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিল।
বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিক্ষক রওশনারা খাতুন বলেন, বিয়ে হচ্ছে আমরা শুনেছি।তবে বাল্যবিয়ের মতো একটি ঘটনা জানার পরও উপজেলা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরকে বিষয়টি জানানো হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা কাউকে ইনফরমেশন করিনি।
পরে খবর পেয়ে কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া আক্তার, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা অর্না চক্রবর্তী, থানা পুলিশ ও আনসার সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বিয়ের আয়োজন বন্ধ করা হয়।
বাল্যবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করায় কিশোরীর বাবার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে একই দিনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া আক্তার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(৫) ধারায় উপজেলার পশ্চিম মৌতলার শেখ সিরাজুল ইসলামের ছেলে মাসুদুর রহমান মিন্টুকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
বাল্যবিয়ের ঘটনায় বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশাসনিকভাবে জবাবদিহির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসির উদ্দীন বলেন, যেহেতু শিক্ষা অফিসার আমাদের ডেকেছেন এবং ইউএনও মহোদয় বিষয়টি অবহিত হয়েছেন, এ কারণে আমাদের কিছু বলার নেই। তাঁরা যে পদক্ষেপ নেন, আমরা তা মেনে নেব।
কালিগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসার জয়নাল আবেদীন বলেন, শিক্ষকদের নিয়ে ইউএনও মহোদয়ের সঙ্গে আমরা বসেছি। ইউএনও মহোদয় লিখিত জবাব দিতে বলেছেন। তাঁরা লিখিত জবাব দেবেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে পরিবার ও প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় থেকেই যদি শিক্ষার্থীদের বাল্যবিয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা হয় এবং এমন আয়োজন প্রতিরোধে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে এ ধরনের ঘটনা অনেকাংশে ঠেকানো সম্ভব। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ভূমিকা যথাযথভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাল্যবিয়ের মতো ঘটনা জানার পর দায়িত্বশীলদের দ্রুত প্রশাসনকে অবহিত করা জরুরি। রামনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ঘটনাটি সেই দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।


