
মো: সালাউদ্দীন
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সংযুক্তি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দুই শিক্ষক মাসের পর মাস অন্য বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া মৌখিক নির্দেশে আরও দুই শিক্ষককে অন্য বিদ্যালয়ে সংযুক্ত রাখার তথ্য পাওয়া গেছে। মেয়াদ শেষ হওয়া শিক্ষকদের মূল কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশনা থাকলেও তা কার্যকর হয়নি; তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। পরে তথ্য অধিকার আইনে এ বিষয়ে তথ্য চাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মূল কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত ৭ অক্টোবর শিক্ষকদের সংযুক্তির বিষয়ে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেন এই প্রতিবেদক। ১৩ অক্টোবর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সোহেল শাহজাদার স্বাক্ষরিত চিঠিতে সরবরাহ করা তথ্যে ছয়জন শিক্ষকের সংযুক্তির বিষয়টি উঠে আসে। এর মধ্যে চারজনের সংযুক্তির লিখিত আদেশ ছিল। তাঁদের দুজনের সংযুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তাঁরা অন্য বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বাকি দুজনকে মৌখিক নির্দেশে সংযুক্ত রাখার তথ্য পাওয়া যায়।
গজপুরী পশ্চিমগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রোকসানা আক্তারকে ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত আদেশে পেডলবাড়ী-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। আদেশ অনুযায়ী, তাঁর সংযুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। মেয়াদ শেষে সংযুক্তির আদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার কথা থাকলেও তিনি ওই বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখেন। পরে ১৩ অক্টোবর তিনি মূল কর্মস্থলে ফিরে যান।
রোকসানা আক্তার বলেন, “মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই সেখানে ছিলাম। উপজেলা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অনুমতি নিয়েছিলাম, তবে লিখিত কাগজ পাইনি। ”তাঁর মূল কর্মস্থল গজপুরী পশ্চিমগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাসনা বেগমের দাবি, সংযুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। তবে তাঁকে ওই শিক্ষককে অন্য বিদ্যালয়ে রাখার কথা বলা হয়।
হাসনা বেগম বলেন, “ডিপিও স্যার বলেন লিখিত লাগবে না, ওইভাবেই থাক। পরে আর চাপ দিইনি। সংযুক্তির বিষয়ে তো আমার কোনো এখতিয়ার নেই।”
একইভাবে টোকরাভাষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. সফিউল হককে ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট লিখিত আদেশে বেউলাডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। আদেশ অনুযায়ী, তাঁর সংযুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। মেয়াদ শেষ হলেও তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৩ অক্টোবর মূল কর্মস্থলে ফিরে যান।
সফিউল হক বলেন, “মেয়াদ শেষ হওয়ার পাঁচ দিন আগে শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে বলেন, ওই এলাকার লোকজন ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা আমাকে সেখানে রাখার অনুরোধ করেছেন। তাই আপাতত সেখানেই থাকতে বলেন এবং পরে লিখিতভাবে সংযুক্তির আদেশ দেবেন বলে জানান। তাঁর মৌখিক নির্দেশেই সেখানে ছিলাম। পরে লিখিত আদেশের বিষয়ে যোগাযোগ করলেও আর দেওয়া হয়নি। সংযুক্তিতে থাকা শিক্ষকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যেতে বলা হলে আমিও ফিরে আসি।”
মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ওই শিক্ষক মূল কর্মস্থলে না ফেরায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, জানতে চাইলে টোকরাভাষা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, লিখিতভাবে বিষয়টি জানানোর সুযোগ ছিল না। তবে বিভিন্ন সভায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছিলাম। ১৩ অক্টোবর ওই শিক্ষক কর্মস্থলে যোগ দেন।
এদিকে, চতুরাডাঙ্গী কালিদাহপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হারুন অর রশিদকে শিক্ষক সংকটের কারণে মৌখিক নির্দেশে শেখবাঁধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। তিনি ৫ জুলাই থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। পরদিন ১৩ অক্টোবর তিনি মূল কর্মস্থলে ফিরে যান।
হারুন অর রশিদ বলেন, “কর্তৃপক্ষ যেটা বলবে, সেটাই তো আমাদের করতে হবে। আমাকে মৌখিকভাবে বলা হয়েছিল, আপনি ওই বিদ্যালয়ে যান, পরে চিঠি করে দেওয়া হবে।” লিখিত আদেশ না পাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পরে ফিরে যেতে বলা হলে তিনি মূল কর্মস্থলে যোগ দেন।
সোনাহার মুন্সিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তাবাসসুম তাহমিনা দেবীগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। উপজেলা শিক্ষা অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে মৌখিক নির্দেশে সেখানে সংযুক্ত রাখা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে পাওয়া নথিতে ভিন্ন তথ্য রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, ১৯ জানুয়ারি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আজমল হোসেনের স্বাক্ষরে তাবাসসুমসহ নয়জন শিক্ষককে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সংযুক্ত করার আদেশ দেওয়া হয়। ওই আদেশ ২৬ জানুয়ারি বাতিল করা হয়। এরপরও তাবাসসুম ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দেবীগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন।
তবে তাবাসসুমের মূল কর্মস্থলের প্রধান শিক্ষক মোছা. নুরুন নাহারের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে তাবাসসুম সংযুক্ত ছিলো। সেখানে কোন নির্দিষ্ট মেয়াদ ছিলো না।
নুরুন নাহার বলেন, “উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত চিঠি অনুযায়ী তাবাসসুম জানুয়ারির ২২ তারিখ থেকে সংযুক্তিতে ছিলেন। ওই আদেশে নির্দিষ্ট মেয়াদ ছিল না; পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে থাকার কথা উল্লেখ ছিল।”
ফলে জানুয়ারির আদেশ বাতিলের পর কোন আদেশের ভিত্তিতে তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন, তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে জানতে তাবাসসুম তাহমিনার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, গত ১০ জুলাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আজমল হোসেনের স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় সংযুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া শিক্ষকদের মূল কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়। তবে নির্দেশনার পরও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অন্য বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়নি। তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পর শিক্ষকদের গ্রুপে আগের নির্দেশনাটি আবার পাঠানো হয় এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মূল কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়।
মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও শিক্ষকদের অন্য বিদ্যালয়ে রাখা, তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়া এবং মৌখিক নির্দেশে সংযুক্তির বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আজমল হোসেন অনানুষ্ঠানিক কথোপকথনে শিক্ষক সংকট, পারিপার্শ্বিক চাপ ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মৌখিক নির্দেশের কথা উল্লেখ করেন। তবে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনার যা খুশি তাই লেখেন। আমি বক্তব্য দিয়ে এর আগে বিপদে পড়েছি।”
পঞ্চগড় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী মিয়া বলেন, “মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থাকার সুযোগ নেই। আমি মৌখিকভাবে কাউকে সংযুক্তিতে দিতে কিংবা কারও মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থাকার বিষয়ে নির্দেশনা দিইনি। এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আজিজুর রহমান বলেন, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জেনে নিবো।


