
হাফিজুল ইসলাম
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার শ্যামল প্রকৃতির কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এক অপূর্ব সবুজ জনপদ গোয়াসপুর। সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার ২ নং গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড। ঐতিহাসিক রাণাপিং পরগনার বুকে অবস্থিত এই গ্রামটি যেন এক ছবি আঁকা ক্যানভাস।
সিলেট অঞ্চলে সুপারিকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘গোয়া’ বা ‘গুয়া’। জনশ্রুতি বলে, একসময় এখানকার টিলা আর পথের দু-পাশে প্রচুর প্রাকৃতিক সুপারি গাছ জন্মাতো। ‘গোয়া’ শব্দের সাথে ‘পুর’ বা নগর যুক্ত হয়ে এটি পরিচিত হয় গোয়াপুর এবং পরবর্তীতে ‘গোয়াসপুর’ নামে। অন্য এক মতে, ফারসি ও আরবি শব্দ ‘গয়াস’ বা ‘গিয়াস’ (যার অর্থ ত্রাণকর্তা বা আশ্রয়) এবং প্রাচীন সংস্কৃত ‘পুর’-এর মিলনে গড়ে উঠেছে এই নামটি।
গোয়াসপুর কেবল প্রকৃতির রূপেই অনন্য নয়; দেশপ্রেম, শিক্ষা, সাহিত্য, মানবসেবা ও চেতনার আলো বিস্তারে এই গ্রামের ভূমিকা ঐতিহাসিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে গোয়াসপুর গ্রামটি ছিল অকুতোভয় দেশপ্রেমিক ও মুক্তিযোদ্ধাদের এক নিরাপদ আশ্রয়স্থল। একক কোনো ব্যক্তি নয়, বরং পুরো গ্রামের সাধারণ মানুষ ও বীর সন্তানদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই গ্রাম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
গোয়াসপুর গ্রামের অবদান কোনো একক সীমারেখায় আবদ্ধ ছিল না। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের ভয়ভীতি তোয়াক্কা না করে গ্রামের প্রায় প্রতিটি মানুষই মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দান, খাবার সরবরাহ, খবরাখবর সরবরাহ এবং নানাভাবে সামরিক ও নৈতিক সহযোগিতা প্রদান করেছিলেন। প্রকৃত অর্থে, গোয়াসপুরে মুক্তিযুদ্ধ একটি সর্বাত্মক জনযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল।
গ্রামের অনেক সাহসী সন্তানই মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন: মোহাম্মদ আব্দুল মছব্বির, আব্দুল লতিফ, আব্দুল আজিজ চুনু মিয়া, আব্দুল বারি, আব্দুর খালিক, ময়না মিয়া সহ গোয়াসপুরের বহু অকুতোভয় সন্তান।
গ্রামের প্রায় সর্বস্তরের মানুষের অবদান থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ও গেজেটভুক্ত চার বীর মুক্তিযোদ্ধা হলেন, ১. আব্দুল আজিজ চুনু মিয়া, ২. আব্দুল বারি, ৩. আব্দুর খালিক, ৪. ময়না মিয়া।
শিক্ষা বিস্তারে গোয়াসপুরের রয়েছে অসামান্য অবদান। শিক্ষার পথ সুগম করতে যুগ যুগ ধরে অনন্য অবদান রেখেছেন আব্দুল মজিদ লস্কর (লন্ডনী), মাস্টার রিয়াজ উদ্দিন, তজম্মুল আলী তোতা মিয়া, ডাক্তার আলা উদ্দিন, শামসুল হক লেচু, ওসি উদ্দিন মাখন মিয়া এবং ফারুক আহমদের মতো মহৎ মানুষেরা।
উপজেলা পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক রিয়াজ উদ্দিন মাস্টারের নেতৃত্বের ঐতিহ্য আজও গোয়াসপুরে অমলিন। শিক্ষানুরাগী ও বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ফারুক আহমদ রাণাপিং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ এবং গোলাপগঞ্জ কোয়ালিটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। প্রবাসে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৩ সালে তিনি অর্জন করেন বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখক পুরস্কার। সাহিত্যের সেই ধারায় গোয়াসপুর-কে সমৃদ্ধ করেছেন তরুণ প্রজন্যের লেখক, ইসলামী স্কলার ও সংবাদকর্মী হাফিজুল ইসলাম লস্কর এবং নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশের দায়িত্বে থেকেও সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাওয়া জাহেদ জারিফের মতো ব্যক্তিত্বরা।
গোয়াসপুরের মাটি ও বাতাসে মিশে আছে সাহিত্য ও সুরের মূর্ছনা। নাগরী লিপির প্রাচীন পুঁথিসাহিত্যিক তৈয়ব আলী তেরা মিয়ার পুঁথি পাঠের আসর কিংবা মরমি কবি দূরবীন শাহের গানে মুগ্ধ থাকা মখন মিয়া ও গোলাম মোহাম্মদ শাহ আবুর সাংস্কৃতিক অবদান গ্রামের ঐতিহ্যকে করেছে সমৃদ্ধ।
নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নে গোয়াসপুরের নারীদের উল্লেখযোগ্য অবদান লক্ষনীয়। বেগম রোকেয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে গোয়াসপুরের নারীরাও পিছিয়ে থাকেননি। শিক্ষার জ্যোতি ছড়াতে অবদান রেখে চলেছেন নাজমিন আক্তার, রওশন জাহান, শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আয়েশা বেগম, মাছুমা খানম হেপী, শাহিমা বেগম ও রহিমা বেগমের মতো নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষিকারা। নারীশিক্ষা ও সামাজিক ক্ষমতায়নে তাঁদের নিষ্ঠা আজ তরুণ প্রজন্মের প্রেরণা।
মানবসেবায় গোয়াসপুরের ঐতিহ্য অপরিসীম। হাজী আব্দুল মনাফ, আব্দুর রশিদ লস্কর, কুতুব আলী, একরাম আলীসহ বহু সমাজসেবকের মানবিকতা গ্রামটির ভিত্তিকে মজবুত করেছে।
স্বাস্থ্যসেবায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত আলা উদ্দিন, ডক্টর মাহফুজ আনাম মুরাদ, সাবেক স্বাস্থ্য পরিদর্শক আব্দুল মুক্তাদির এবং ইউনানী চিকিৎসক হাফিজুল ইসলাম লস্করের অবদান অনস্বীকার্য।
আইন অঙ্গনে সিলেট বারের প্রভাবশালী আইনজীবী নিসার আলী উকিল থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের তরুণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইদুল ইসলাম লস্কর এর পদচারণা গোয়াসপুরের সুনাম বাড়িয়েছে বহু দূর।
জনপ্রতিনিধি হিসেবে ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন প্রাক্তন ইউপি চেয়ারম্যান অসি উদ্দিন মাখন মিয়া এবং তমজ্জুল আলী তুতা মিয়া। রাজনৈতিক অঙ্গনে স্থান করে নিয়েছেন সামসুল ইসলাম আলম ও কদর আহমেদ।
শুধু নিজ দেশেই নয়, গোয়াসপুরের এক বিশাল জনগোষ্ঠী আজ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইতালি ও পর্তুগালে প্রবাসী। দূরে থাকলেও তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও ভালোবাসার ছোঁয়া প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করছে গ্রামের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে।
কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা, সাহিত্য, আইন কিংবা চিকিৎসা প্রতিটি ক্ষেত্রেই গোয়াসপুরের সন্তানরা ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁদের মেধা ও সততা। একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে শুরু হয়ে তাঁদের এই অবদান আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃত। সবুজ প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা গোয়াসপুর একটি নাম, একটি ঐতিহ্য এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা অনুপ্রেরণার এক আলোকবর্তিকা।


