
শাকিল আহমেদ,
শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরব নিয়ে এগিয়ে চলেছে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী হাটবোয়ালিয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় (স্কুল অ্যান্ড কলেজ)। শিক্ষা বিস্তারে পিছিয়ে থাকা এ জনপদের মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মহৎ প্রত্যয় নিয়ে ১৯২৫ সালে বাঁশের চাটাই ও খড়ের তৈরি একটি ঘরে প্রতিষ্ঠিত হয় হাটবোয়ালিয়া এম.ই. স্কুল (মিডল ইংলিশ স্কুল)।
বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনবিদ বিচারপতি ড. রাধাবিনোদ পাল এবং তৎকালীন তরুণ সমাজসেবক ও ছাত্রনেতা ডা. রিয়াজ উদ্দিন আহমদ।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য (১৯৪৪-১৯৪৬), কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং ঐতিহাসিক টোকিও ট্রায়ালের অন্যতম বিচারক বিচারপতি ড. রাধাবিনোদ পাল বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, ডা. রিয়াজ উদ্দিন আহমদ পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে এমএলএ নির্বাচিত হন।
প্রতিষ্ঠার পর ধাপে ধাপে এগিয়ে যায় বিদ্যালয়টি। ১৯৪০ সালে এটি হাই ইংলিশ স্কুলে উন্নীত হয় এবং ১৯৪৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি চালুর মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় বা স্কুল অ্যান্ড কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
কৃতী শিক্ষার্থীদের গৌরবময় অর্জন
হাটবোয়ালিয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইতিহাসে কৃতী শিক্ষার্থীদের অর্জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিদ্যালয়ের তৃতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী মনোজ কুমার পাল ১৯৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলা, আসাম ও উড়িষ্যার ৬৪ হাজার পরীক্ষার্থীর মধ্যে মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কর্মজীবনে তিনি কলকাতার মেঘনাদ সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়া বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী অধ্যাপক মুহাম্মদ কামরুল হুদা রাজশাহী ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হুদা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের মতো অসংখ্য কৃতী শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে বিদ্যালয়ের সুনাম ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন।
বর্তমান নেতৃত্ব ও শতবর্ষের গৌরব
বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন প্রয়াত শ্রী মনমোহন সরকার, বিএ। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. মতিউল হুদা।
দীর্ঘ এক শতাব্দীর পথচলায় হাটবোয়ালিয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এ অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক অগ্রগতির এক ঐতিহাসিক বাতিঘরে পরিণত হয়েছে। গৌরবময় অতীত, ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠাতা, কৃতী শিক্ষার্থী এবং অসংখ্য স্মৃতিকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটি আজও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।
শতবর্ষের এই গৌরবময় ইতিহাস আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে—এমন প্রত্যাশা এলাকাবাসী, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বর্তমান শিক্ষানুরাগীদের।


