
আবু সুফিয়ান বাবু,
মানুষের জীবনে মৃত্যু এক অবধারিত বাস্তবতা। দুনিয়ার সব ব্যস্ততা, সম্পদ, ক্ষমতা, পরিচিতি ও সম্পর্ক একদিন পেছনে ফেলে সবাইকে চলে যেতে হবে চিরস্থায়ী জীবনের পথে। এই চিরন্তন সত্যকে সামনে রেখে জানাজার নামাজের আগে মৃত ব্যক্তির মরদেহ সামনে রেখে মুসল্লিদের উদ্দেশে হৃদয়স্পর্শী নসিহত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ বয়ান তৈরি করা হয়েছে।
বয়ানটিতে মৃত্যুর অনিবার্যতা, কবরের জীবন, বারযাখ, কবরের প্রশ্ন, নেক আমলের গুরুত্ব এবং পরকালীন জবাবদিহির বিষয়গুলো কুরআন ও হাদিসের আলোকে তুলে ধরা হয়েছে।
মৃত্যুই জীবনের চূড়ান্ত বাস্তবতা
বয়ানের শুরুতে মৃত ব্যক্তির নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে উপস্থিত মুসল্লিদের নিজেদের জীবনের পরিণতি নিয়ে ভাবার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কিছুক্ষণ আগেও যিনি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করেছেন, কথা বলেছেন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা করেছেন, মৃত্যুর পর সেই মানুষটিই আজ নিশ্চুপ ও নিথর। তাঁর আর কোনো কথা নেই, দুনিয়ার কোনো কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ১৮৫ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। প্রকৃত সফলতা হলো জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করা।
বয়ানে মুসল্লিদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, আজ আমরা অন্যের জানাজায় অংশ নিচ্ছি, কিন্তু একদিন আমাদের জানাজায়ও অন্যরা অংশ নেবেন। আজ অন্যের জন্য দোয়া করছি, আগামীকাল হয়তো আমাদের জন্যই কেউ দোয়া করবেন।
মৃত্যুর পর মানুষের সঙ্গে থাকবে শুধু আমল
বয়ানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে তুলে ধরা হয়েছে, মৃত্যুর পর মানুষের পরিবার ও সম্পদ দুনিয়ায় ফিরে গেলেও তার আমল তার সঙ্গে থেকে যায়।
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির পেছনে পরিবার, সম্পদ ও আমল—এই তিনটি বিষয় যায়। পরে পরিবার ও সম্পদ ফিরে আসে, কিন্তু আমল তার সঙ্গে থেকে যায়।
এই শিক্ষার আলোকে বলা হয়েছে, সম্পদ অর্জন, বাড়ি-জমি ক্রয় কিংবা দুনিয়ার নানা স্বার্থে মানুষ যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, পরকালের প্রস্তুতিই হওয়া উচিত জীবনের প্রধান লক্ষ্য।
কবরের জীবন ও ফেরেশতাদের প্রশ্ন
বয়ানে মৃত্যুর পর বারযাখের জীবন সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মুমিনূনের ১০০ নম্বর আয়াতে মৃত্যুর পর পুনরুত্থান পর্যন্ত মধ্যবর্তী জীবনের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া সহিহ বুখারি ও মুসলিমের হাদিসের আলোকে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তিকে কবরে রেখে স্বজনরা ফিরে যাওয়ার সময় সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়।
কবরে দুই ফেরেশতার প্রশ্নের বিষয়টিও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে মানুষকে তার রব, দ্বীন ও নবী সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর তাওফিকে সঠিক উত্তর দিতে সক্ষম হবেন।
বয়ানে মুসল্লিদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, শুধু মুখে ঈমানের কথা বললেই হবে না; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঈমানের দাবি পূরণ করতে হবে। নিয়মিত নামাজ আদায়, হালাল উপার্জন, সুন্নাহর অনুসরণ এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে ঈমানকে শক্তিশালী করতে হবে।
কবরের শাস্তি থেকে বাঁচতে পবিত্রতা ও উত্তম চরিত্র জরুরি
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত দুটি কবরের শাস্তির ঘটনা উল্লেখ করে বয়ানে পবিত্রতা রক্ষা এবং মানুষের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি থেকে বিরত থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
বিশেষ করে প্রস্রাবের অপবিত্রতা থেকে সতর্ক না থাকা, চোগলখুরি, গিবত, মিথ্যা, পরনিন্দা ও মানুষের হক নষ্ট করার মতো কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বক্তব্যে বলা হয়েছে, কবরের জীবনে শান্তি পেতে হলে দুনিয়ার জীবনকে আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত করতে হবে।
মৃত্যুর পরও সওয়াব পাওয়ার তিনটি মাধ্যম
বয়ানে সহিহ মুসলিমের ১৬৩১ নম্বর হাদিসের আলোকে মৃত্যুর পরও যে তিনটি আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকতে পারে, তা তুলে ধরা হয়েছে।
১. সদকায়ে জারিয়া বা চলমান দান।
২. উপকারী জ্ঞান, যা মানুষের কল্যাণে কাজে আসে।
৩. নেক সন্তান, যে মৃত্যুর পর মা-বাবার জন্য দোয়া করে।
এ প্রসঙ্গে সন্তানদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় গড়ে তোলা, মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণে সহযোগিতা, মানুষের উপকারে আসে এমন কাজ করা এবং উপকারী জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জীবিত থাকতেই তওবা ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান
পবিত্র কুরআনের সূরা আল-হাশরের ১৮ নম্বর আয়াতের আলোকে প্রত্যেক মানুষকে নিজের পরকালের প্রস্তুতি নিয়ে চিন্তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বয়ানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মজিজ্ঞাসার বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। যেমন—পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় হচ্ছে কি না, উপার্জন হালাল কি না, মা-বাবার হক আদায় করা হচ্ছে কি না, কারও প্রতি জুলুম করা হয়েছে কি না এবং মানুষের কোনো অধিকার নষ্ট করা হয়েছে কি না।
পাশাপাশি জীবিত থাকতেই আল্লাহর কাছে তওবা করা, মানুষের পাওনা ফিরিয়ে দেওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নেক আমলে জীবন পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও সবার জন্য শিক্ষা
বয়ানের শেষাংশে বলা হয়েছে, জানাজা শুধু একজন মৃত ব্যক্তির বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জীবিত মানুষের জন্যও আত্মসমালোচনা ও শিক্ষা গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
আর কিছুক্ষণ পর মরদেহটি কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। স্বজন, পরিবার ও পরিচিতজনেরা ফিরে আসবেন। কিন্তু মৃত ব্যক্তির দুনিয়ার জীবনের আমলই হবে তার পরকালীন জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাথেয়।
এ সময় মৃত ব্যক্তির ক্ষমা, রহমত, কবরের প্রশস্ততা, কবরের আজাব থেকে মুক্তি এবং জান্নাতুল ফিরদাউস লাভের জন্য দোয়া করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বয়ানে উল্লেখিত দোয়ার মধ্যে রয়েছে—
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ
অর্থ: হে আল্লাহ! তাঁকে ক্ষমা করুন, তাঁর প্রতি রহম করুন, তাঁকে নিরাপত্তা দান করুন এবং তাঁর ত্রুটিগুলো মার্জনা করুন।
পরিশেষে জীবিত সবাইকে ঈমানের সঙ্গে জীবনযাপন এবং ঈমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করার তাওফিক কামনা করা হয়েছে।
বয়ানের মূল শিক্ষা: আজ যে মানুষটি আমাদের সামনে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন, একদিন আমাদেরও এমন অবস্থায় পড়ে থাকতে হবে। তাই দুনিয়ার মোহে আখিরাতকে ভুলে না গিয়ে সময় থাকতেই আল্লাহর পথে ফিরে আসা এবং নেক আমলে জীবন সাজানো প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।


