
হাবিবুর রহমান হাবিব,
এক পাশে ধূপকাঠি ও অগুরুর সুবাস, অন্য পাশে আতরের স্নিগ্ধ ঘ্রাণ। এক প্রান্তে ঢাকঢোল আর শঙ্খধ্বনি, ঠিক তার ছয় ফুট দূরত্বে ভেসে আসছে মুয়াজ্জিনের শ্রুতিমধুর আজানের সুর। ভিন্ন দুই বিশ্বাসের এমন অপূর্ব মিলনমেলা আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি দেখতে হলে আসতে হবে লালমনিরহাট শহরের পুরান বাজার কালীবাড়ী এলাকায়। এখানে একই আঙিনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন ‘শ্রীশ্রী দুর্গা ও কালীমন্দির’ এবং ‘পুরান বাজার জামে মসজিদ’।
যুগের পর যুগ ধরে কোনো রূপ অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ধর্মীয় সহাবস্থানের যে সংস্কৃতি এই মাটিতে গড়ে উঠেছে, তা যেন পুরো দেশের জন্যই সম্প্রীতির এক অনন্য আলোকবর্তিকা।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা ও ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৩৬ সালে পুরান বাজারে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক কালীমন্দিরটি। মন্দিরটিকে কেন্দ্র করেই পরবর্তী সময়ে পুরো এলাকাটি ‘কালীবাড়ী’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এর প্রায় আট দশক পর, ১৯১৫ সালে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ নামাজ আদায়ের সুবিধার্থে মন্দিরের পাশেই একই আঙিনায় একটি ওয়াক্তিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন। কালের পরিক্রমায় সেই ওয়াক্তিয়া মসজিদটিই আজকের পুরান বাজার জামে মসজিদে রূপ নিয়েছে। আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কালীমন্দিরের পাশেই যুক্ত হয় দুর্গামন্দির।
মসজিদ ও মন্দিরের মধ্যবর্তী দূরত্ব মাত্র ছয় ফুট। স্থানসংকট বা কাছাকাছি অবস্থানের কারণে কোনোদিন এখানকার মানুষের সম্পর্কের দূরত্ব বাড়েনি, বরং তা আরও গাঢ় হয়েছে। প্রতিদিন অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করেন উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ।
আজানের ধ্বনি বাজা মাত্রই মন্দিরে ঢাকঢোলসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজানো বন্ধ রাখা হয়। নামাজের জামাত শেষ হওয়া পর্যন্ত এই নীরবতা বজায় থাকে। নামাজ শেষ হলে আবার স্বাভাবিক গতিতে শুরু হয় মন্দিরের পূজার্চনা ও বাদ্যযন্ত্র।
দুর্গাপূজা, কালীপূজা কিংবা পবিত্র রমজান, ঈদ ও জুমার দিনগুলোতে উভয় কমিটির প্রতিনিধিরা আগেই বৈঠকে বসেন। মাইকের শব্দ, পূজার সময়সূচি এবং মুসল্লিদের চলাচলের পথ সুগম রাখতে নেওয়া হয় যৌথ সিদ্ধান্ত।
মসজিদ থেকে নামাজ শেষে বের হলেই চোখে পড়ে মন্দিরের প্রতিমা ও ভক্তদের ভক্তি নিবেদন। আবার পূজা দিতে আসা দর্শনার্থীরাও খুব কাছ থেকে দেখেন মুসল্লিদের সিজদার দৃশ্য।
মন্দিরের একজন পুজারি বলেন:
“আমরা ছোটবেলা থেকেই কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়া পরম শান্তিতে দুর্গাপূজা ও ধর্মীয় উৎসবগুলো পালন করে আসছি। লালমনিরহাটের এই পরিবেশ আমাদের জন্য অনেক বড় গর্বের বিষয়।”
মসজিদের মুসল্লি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান:
“এখানে ধর্ম যার যার হলেও সামাজিক অনুষ্ঠান ও সম্প্রীতি সবার। আমাদের সন্তানেরা ছোটবেলা থেকেই একে অপরকে শ্রদ্ধা করতে শিখছে। এটি আমাদের লালমনিরহাটের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।”
একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের এই বিরল সহাবস্থান দেখতে প্রতিদিন দেশের দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থী, গবেষক, সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন সময়ে একাধিক দেশের রাষ্ট্রদূতও লালমনিরহাটের এই ঐতিহ্যবাহী স্থান পরিদর্শন করে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং একে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও ভালোবাসা যে মানবজাতিকে এক সুতোয় গেঁথে রাখতে পারে—লালমনিরহাটের কালীবাড়ী তার এক জীবন্ত প্রমাণ। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদ ও মন্দির যেন প্রতিদিন নীরবে সেই চিরন্তন বাণীই প্রচার করে চলেছে: ‘ধর্ম যার যার, উৎসব ও সম্প্রীতি সবার।’


