
আবু সুফিয়ান বাবু,
ইসলামি শরিয়তে বিবাহকে পবিত্র বন্ধন ও পরিবার গঠনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের পাশাপাশি ধর্মীয় বিধিবিধান মেনে চলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে নির্দিষ্ট কিছু আত্মীয়তার সম্পর্ক ও পরিস্থিতিতে নারীদের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম।
পবিত্র কুরআনের সুরা আন-নিসার ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতে যেসব নারীর সঙ্গে বিবাহ হারাম, তাঁদের সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী, এসব নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য হলো পারিবারিক সম্পর্কের মর্যাদা রক্ষা, বংশপরিচয়ের শুদ্ধতা বজায় রাখা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা।
রক্তের সম্পর্কের যেসব নারীর সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, রক্তের সম্পর্কের কারণে পুরুষের জন্য মা, দাদি-নানি ও তাঁদের ঊর্ধ্বতন বংশধর, মেয়ে, নাতনি ও তাঁদের নিম্নতন বংশধর, আপন ও বৈমাত্রেয়- বৈপিত্রেয় বোন, ফুফু, খালা, ভাইয়ের মেয়ে এবং বোনের মেয়েকে বিয়ে করা চিরতরে নিষিদ্ধ।
দুধ সম্পর্কের কারণে বিবাহ নিষিদ্ধ
ইসলামে দুধ সম্পর্ককেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শরিয়তের নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে দুধমা, দুধবোন এবং দুধ সম্পর্কের মাধ্যমে মাহরাম হওয়া নির্দিষ্ট আত্মীয়দের সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ হয়। এ ক্ষেত্রে দুধ সম্পর্কের বিস্তারিত বিধান জানতে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে যাঁদের বিয়ে করা যায় না
বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতেও কয়েক শ্রেণির নারীর সঙ্গে বিবাহ নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে বাবার স্ত্রী, স্ত্রীর মা, নির্দিষ্ট শর্তে স্ত্রীর আগের পক্ষের মেয়ে এবং নিজের ছেলে বা নাতি-নাতনির স্ত্রী।
তবে এসব বিধানের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, স্ত্রীর আগের পক্ষের মেয়েকে বিয়ে করার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট শরয়ি শর্ত পূরণ হওয়া জরুরি।
যেসব পরিস্থিতিতে বিবাহ নিষিদ্ধ
নির্দিষ্ট আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়াও কিছু পরিস্থিতিতে বিবাহ বৈধ নয়। যেমন—কোনো নারীর ইদ্দত চলাকালে তাঁকে বিয়ে করা, অন্যের বৈধ বিবাহে থাকা নারীকে বিয়ে করা এবং একসঙ্গে এমন দুই নারীকে বিবাহ করা, যাঁদের মধ্যে একজনকে পুরুষ হিসেবে কল্পনা করলে অন্যজনকে বিয়ে করা বৈধ হতো না। উদাহরণ হিসেবে কোনো নারীকে তাঁর ফুফু বা খালার সঙ্গে একই সময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করার বিষয়টি উল্লেখ করা যায়।
এ ছাড়া একজন পুরুষের জন্য একই সময়ে চারজনের বেশি স্ত্রী রাখা বৈধ নয়। তিন তালাকের পর আগের স্বামীর সঙ্গে পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রেও শরিয়তে নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। পরিকল্পিত বা কৃত্রিমভাবে হালালা করানোকে বৈধ সমাধান হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
মুসলিম পুরুষের অমুসলিম নারীকে বিয়ের বিধানেও ধর্মীয় শ্রেণি ও অন্যান্য শর্তের পার্থক্য রয়েছে। তাই এ বিষয়ে সব অমুসলিম নারীর ক্ষেত্রে একই বিধান প্রয়োগ না করে সংশ্লিষ্ট ফিকহি নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
দাম্পত্য জীবনে দ্বীনদারির গুরুত্ব
ইসলামে জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দ্বীনদারি, উত্তম চরিত্র, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্বশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন ভালো জীবনসঙ্গী শুধু পার্থিব জীবনের সুখ-দুঃখের সাথিই নন, বরং নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অনুসরণেও সহায়ক হতে পারেন।
তবে ‘যে তোমাকে ভালোবাসতে ভালোবাসতে জান্নাত পর্যন্ত নিয়ে যাবে’—এ ধরনের বক্তব্যকে নবী করিম (সা.)-এর সরাসরি হাদিস হিসেবে প্রচার করার আগে নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থে এর সূত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, বিবাহের ক্ষেত্রে শুধু সামাজিক পছন্দ বা পারিবারিক সম্মতিই নয়, শরিয়তের নির্ধারিত সীমারেখাও বিবেচনা করা জরুরি। এ বিষয়ে কোনো জটিলতা বা বিশেষ পরিস্থিতি দেখা দিলে অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


