
আবু সুফিয়ান বাবু,
ইসলামে সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে শুক্রবার বা জুমার দিন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও বরকতময়। মুসলিম উম্মাহর কাছে দিনটি সাপ্তাহিক ঈদের মতো। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে জুমার দিনের গুরুত্ব, ফজিলত এবং বিশেষ কিছু আমলের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এ দিনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানবজাতির আদি ইতিহাস এবং কিয়ামতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত আদম (আ.)-কে শুক্রবার সৃষ্টি করা হয়েছিল। এ দিনই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয় এবং পরে পৃথিবীতে পাঠানো হয়। এমনকি কিয়ামতও সংঘটিত হবে শুক্রবারে। এ দিনের একটি বিশেষ সময়ে বান্দার দোয়া কবুল হওয়ার সুসংবাদও রয়েছে।
মুসলিম উম্মাহর জন্য বিশেষ মর্যাদার দিন জুমা
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুনিয়ায় মুসলমানদের আগমন অন্যদের পরে হলেও কিয়ামতের দিন তারা হবে অগ্রগামী। পূর্ববর্তী জাতিগুলোকে বিশেষ দিন দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা এ বিষয়ে মতভেদে জড়িয়ে পড়ে। পরে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জুমার দিনের পথ দেখান।
এ কারণে শনিবার ইহুদিদের এবং রবিবার খ্রিষ্টানদের ইবাদতের দিন হলেও মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে শুক্রবার। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৭৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৫)
জুমার দিনের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
হাদিসে জুমার দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনযির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের পাঁচটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা জানিয়েছেন।
১. এ দিন আল্লাহ তাআলা হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন।
২. এ দিন তাঁকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে।
৩. শুক্রবারেই তাঁর ইন্তেকাল হয়েছে।
৪. এ দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে দোয়া করলে তিনি তা কবুল করেন—যদি সে হারাম কোনো বিষয়ের প্রার্থনা না করে।
৫. এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।
জুমার রাতে আমলনামা পেশের বিষয়
জুমার দিনের পাশাপাশি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে আদমসন্তানের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। তবে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর আমল কবুল না হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত এ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১০২৭২; আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৬১২)
এ থেকে বোঝা যায়, ইবাদতের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং সম্পর্কের বন্ধন অটুট রাখাও একজন মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
জান্নাতবাসীদের জন্য থাকবে বিশেষ আনন্দের আয়োজন
জুমার দিনের মর্যাদা শুধু দুনিয়ার জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়; আখিরাতেও এ দিনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। হাদিসের একটি বর্ণনায় জান্নাতবাসীদের জন্য ‘ইয়াউমুল মাযীদ’ বা অতিরিক্ত প্রাপ্তির দিনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে জুমার দিনকে নবীজি (সা.) ও তাঁর উম্মতের জন্য ঈদের দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বর্ণনায় জান্নাতবাসীদের জন্য বিশেষ নেয়ামত, আনন্দ, পোশাক, খাবার ও পানীয়ের আয়োজনের কথাও এসেছে।
এ দিনের বিশেষ প্রাপ্তির মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের সৌভাগ্য। (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস: ৪২২৮; আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি, ৩/৫৫, হাদিস: ২১০৫৪)
এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত গুনাহ মাফের সুসংবাদ
জুমার দিনের অন্যতম বড় ফজিলত হলো, সঠিক নিয়মে জুমার নামাজ আদায় করলে এক সপ্তাহের ছোটখাটো গুনাহ মাফের সুসংবাদ পাওয়া যায়।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত সময়ের মধ্যবর্তী গুনাহগুলোর জন্য কাফফারা বা পাপমোচনের মাধ্যম হয়, যদি বান্দা কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১০৮৬; জামে তিরমিজি, হাদিস: ৪১৪)
অন্য একটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি উত্তমভাবে অজু করে জুমার নামাজে উপস্থিত হয়, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে এবং নীরব থাকে, তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহের পাশাপাশি অতিরিক্ত তিন দিনের গুনাহও মাফ করে দেওয়া হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও সতর্ক করেছেন, খুতবা চলাকালে কেউ যদি কঙ্কর নিয়ে নাড়াচাড়া করে, তবে সে অনর্থক কাজে লিপ্ত হলো।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১০৫০)
এখানে গুনাহ মাফের সুসংবাদটি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকার শর্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শুধু জুমার নামাজে উপস্থিত হওয়া নয়, বরং নামাজ ও খুতবার আদব যথাযথভাবে পালন করাও জরুরি।
জুমার দিনে যেসব আমল করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ
জুমার দিনের বরকত ও ফজিলত অর্জনের জন্য মুসলমানদের কিছু সুন্নত ও নেক আমলের প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়া উচিত।
১. জুমার দিন গোসল করা: এ দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং গোসল করে মসজিদে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল।
২. সুন্দর পোশাক পরিধান: সামর্থ্য অনুযায়ী পরিচ্ছন্ন ও উত্তম পোশাক পরে মসজিদে যাওয়া।
৩. সুগন্ধি ব্যবহার: পুরুষদের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী সুগন্ধি ব্যবহার করা।
৪. আগেভাগে মসজিদে উপস্থিত হওয়া: জুমার নামাজের জন্য তাড়াহুড়া না করে যথেষ্ট সময় হাতে নিয়ে মসজিদে যাওয়া। নামাজের আগে নফল ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত ও জিকিরে সময় কাটানো।
৫. দরুদ শরিফ পাঠ করা: জুমার দিনে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
৬. সূরা কাহফ তিলাওয়াত: জুমার দিনে সূরা কাহফ পাঠের বিশেষ ফজিলত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
৭. বেশি বেশি দোয়া করা: জুমার দিনের বিশেষ দোয়া কবুলের সময়টি পাওয়ার আশায় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা।
৮. খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা: ইমাম যখন খুতবা দেন, তখন চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে শোনা। অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকা।
৯. মুসল্লিদের কষ্ট না দেওয়া: মসজিদে আগে থেকে বসে থাকা মুসল্লিদের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনে যাওয়া কিংবা দুজনের মাঝখানে জোর করে জায়গা করে নেওয়া থেকে বিরত থাকা।
১০. অনর্থক কাজ পরিহার করা: খুতবা চলাকালে মোবাইল ফোন ব্যবহার, কথাবার্তা বলা কিংবা অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকা।
ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের হক আদায়েও যত্নবান হতে হবে
জুমার দিন শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে নামাজ আদায়ের দিন নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা প্রার্থনা, আল্লাহর স্মরণ এবং ভালো কাজের মাধ্যমে জীবনকে সুন্দর করারও একটি সুযোগ।
এ দিন বেশি বেশি ইস্তিগফার করা, দরুদ পাঠ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা এবং আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নেওয়ার মাধ্যমে নেক আমলের পরিমাণ বাড়ানো যায়।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার দিনের প্রকৃত ফজিলত বোঝার, সুন্নত অনুযায়ী আমল করার এবং সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।


