
আবু সুফিয়ান বাবু,
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো মৃত্যু। পৃথিবীতে কে কখন জন্মগ্রহণ করবে, তার একটি ধারাবাহিকতা থাকলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ক্রম নেই। কখনো দাদার আগে নাতির মৃত্যু হয়, কখনো সুস্থ-সবল মানুষও হঠাৎ মৃত্যুর মুখোমুখি হন। তাই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা না করে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর বিধান মেনে চলা এবং নিয়মিত নামাজসহ সব ধরনের ইবাদত আদায় করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।
ইসলামে নামাজকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নির্ধারিত সময়ে নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে মৃত্যুর আগে সৎকর্ম করার প্রতিও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
পবিত্র কুরআনে মৃত্যুর বাস্তবতা ও আমলের নির্দেশনা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮৫)
অর্থাৎ পৃথিবীর কোনো মানুষই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পাবে না। ধনী-গরিব, ছোট-বড়, সুস্থ-অসুস্থ—প্রত্যেককেই একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে।
সূরা আল-আরাফের ৩৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যখন কোনো জাতির নির্ধারিত সময় এসে যায়, তখন তারা এক মুহূর্তও পিছিয়ে যেতে পারে না কিংবা এগিয়ে আসতে পারে না।
আবার সূরা লুকমানের ৩৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ জানিয়েছেন, কোনো মানুষ জানে না কোন ভূমিতে তার মৃত্যু হবে। অর্থাৎ মৃত্যুর সময় ও স্থান মানুষের অজানা।
মৃত্যু আসার আগেই সৎকর্ম করার নির্দেশ দিয়ে সূরা আল-মুনাফিকুনের ১০-১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, মৃত্যু আসার আগে তিনি যে রিজিক দিয়েছেন, তা থেকে ব্যয় করতে। নির্ধারিত সময় এসে গেলে কাউকে আর অবকাশ দেওয়া হবে না।
নামাজের গুরুত্ব তুলে ধরে সূরা আন-নিসার ১০৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই নামাজ মুমিনদের ওপর নির্ধারিত সময়ে ফরজ করা হয়েছে।’
এ ছাড়া সূরা আল-বাকারার ৪৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নামাজ কায়েমের নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে সূরা আল-মুদ্দাসসিরের ৪২-৪৩ নম্বর আয়াতে জাহান্নামবাসীদের কাছে তাদের জাহান্নামে যাওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হলে তারা বলবে, ‘আমরা নামাজ আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না।’
হাদিসেও সময়ের মূল্য ও মৃত্যুর আগে আমলের গুরুত্ব
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মুসলমানদের দুনিয়ার জীবনকে অস্থায়ী সফরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সহিহ বুখারির ৬৪১৬ নম্বর হাদিসে ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ায় এমনভাবে থাকো, যেন তুমি একজন অপরিচিত ব্যক্তি অথবা পথিক।’
ইবনে উমর (রা.) আরও উপদেশ দিতেন, সন্ধ্যা হলে সকালের অপেক্ষা করো না, সকাল হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে এবং মৃত্যুর আগে জীবনকে কাজে লাগাও।
সহিহ বুখারির ৬৪১২ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত—সুস্থতা ও অবসর।’
অন্য একটি হাদিসে পাঁচটি বিষয়কে পাঁচটি বিষয়ের আগে মূল্যবান মনে করার কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হলো—বার্ধক্যের আগে যৌবন, অসুস্থতার আগে সুস্থতা, দারিদ্র্যের আগে সচ্ছলতা, ব্যস্ততার আগে অবসর এবং মৃত্যুর আগে জীবন। (মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৭৯১৬)
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যু বেশি বেশি স্মরণ করার উপদেশ দিয়েছেন। (জামে তিরমিযি, হাদিস: ২৩০৭)
নামাজের গুরুত্ব সম্পর্কে জামে তিরমিযির ৪১৩ নম্বর হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন বান্দার আমলের মধ্যে সর্বপ্রথম নামাজের হিসাব নেওয়া হবে। নামাজের হিসাব সঠিক হলে সে সফল হবে, আর নামাজের হিসাব নষ্ট হলে সে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সহিহ মুসলিমের ৮২ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বান্দা এবং শিরক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ ছেড়ে দেওয়া।’
তাই সময় থাকতে নামাজে ফিরে আসুন
জীবন কখন শেষ হয়ে যাবে, তা কারও জানা নেই। আজ যে মানুষ সুস্থভাবে চলাফেরা করছেন, আগামীকাল হয়তো তিনি আর এই পৃথিবীতে থাকবেন না। তাই ইবাদত করার জন্য বার্ধক্য, অবসর কিংবা বিশেষ কোনো সময়ের অপেক্ষা করা উচিত নয়।
প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যেও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং মানুষের হক আদায় করার চেষ্টা করা প্রত্যেকের উচিত।
মনে রাখতে হবে, মৃত্যুর পর আর দুনিয়ায় ফিরে এসে নতুন করে আমল করার সুযোগ থাকবে না। তাই জীবন থাকতে নামাজ আদায় করুন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করুন এবং পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণ করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সঠিক ব্যবহার, নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় এবং মৃত্যুর আগে নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।


