
আহমদ রেজা
“নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে পালিত হয়েছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস ২০২৬। দিবসটি উপলক্ষে বুধবার (২৮ অক্টোবর) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) যৌথ আয়োজনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এমপি। সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) চট্টগ্রামের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুল হালিম, চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক এবং চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, বিপিএম।
অনুষ্ঠানের শুরুতে র্যালি, সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ ও ট্রাফিক আইনবিষয়ক প্রচারণা চালানো হয়। পরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তারা সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আইন মেনে চলা, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, চালকদের প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সড়ক নিরাপত্তায় মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি: প্রতিমন্ত্রী
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, এবারের প্রতিপাদ্য অত্যন্ত সময়োপযোগী। সড়ক কেবল ইট-পাথরের অবকাঠামো নয়, এটি একটি দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। সড়ক নিরাপদ না হলে টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের সড়ক যোগাযোগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, কর্ণফুলী টানেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো অবকাঠামো যোগাযোগব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়েছে। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের আচরণ ও মানসিকতার পরিবর্তন নিশ্চিত করাও জরুরি।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চারটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী।
প্রথমত, আইনের কঠোর প্রয়োগ: লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অতিরিক্ত গতির বিরুদ্ধে বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
দ্বিতীয়ত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম: চালকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রশিক্ষণ ও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। পরিবহন মালিকদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চালকদের প্রতি মানবিক আচরণ করতে হবে এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, জনসচেতনতা বৃদ্ধি: শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা দিয়ে সড়ক নিরাপদ করা সম্ভব নয়। ফুটওভারব্রিজ থাকা সত্ত্বেও ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো এবং উল্টো পথে যানবাহন চালানোর মতো অনিয়ম বন্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না।
চতুর্থত, চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা: বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ভারী যানবাহনের চাপ বেশি থাকায় সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, অবৈধ যানবাহনের স্ট্যান্ড অপসারণ এবং যত্রতত্র পার্কিং বন্ধে জেলা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন তিনি।
আইন মেনে চলার আহ্বান
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় না, বরং একটি পরিবারকে বিপর্যস্ত করে দেয়। তাই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, চালক, যাত্রী ও পথচারী—সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি সবাইকে আইন মেনে সড়কে চলাচল এবং নিরাপদে ঘরে ফেরার অঙ্গীকার করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে সুন্দর আয়োজনের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।
আলোচনা সভায় সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন এবং নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।


