ajkerprithibi
, , ,
  1. অপরাধ
  2. অভিযান
  3. অর্থনীতি
  4. আইন-আদালত
  5. আন্তর্জাতিক
  6. আবহাওয়া
  7. কৃষি
  8. ক্যাম্পাস
  9. খেলাধুলা
  10. গণমাধ্যম
  11. চাকরি
  12. জাতীয়
  13. ট্যুরিজম
  14. দেশজুড়ে
  15. ধর্ম

শিশুর সুরক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন

Ajker prithibi
অক্টোবর ২৪, ২০২৬ ১১:২৩ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মো. সহিদুল ইসলাম সুমন

একটি শিশুর জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা নিরাপত্তা, স্নেহ ও জ্ঞান অর্জনের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। যে হাতে শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়ার কথা, সেই হাতের বিরুদ্ধেই যদি কোনো শিশু যৌন হয়রানি কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শের অভিযোগ তোলে, তবে তা কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত বেদনা নয়; এটি গোটা সমাজের বিবেক, শিক্ষাব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। বিশেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তি যখন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কিংবা দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত থাকেন, তখন প্রশ্ন ওঠে—ধর্মীয় পরিচয় কি জবাবদিহি এড়ানোর ঢাল হতে পারে? প্রতিষ্ঠানের সম্মান রক্ষার নামে কি একটি শিশুর কান্না, ভয় ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে আড়াল করা যায়?
সম্প্রতি গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সী এক মাদ্রাসাছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে একজন উপাধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনা এই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের পর সে ভয়ে কয়েক দিন মাদ্রাসায় যেতে চায়নি। পরে পরিবারের কাছে ঘটনা প্রকাশ পেলে তাঁর বাবা মাদ্রাসায় গিয়ে ব্যাখ্যা চান। একপর্যায়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করা হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেয়। মামলার পর আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অন্যদিকে, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও পাল্টা অভিযোগ ওঠার কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রতিটি অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানো অপরাধ প্রমাণের সমান নয়; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—অভিযোগের তদন্ত যতক্ষণ চলবে, ততক্ষণ শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এক মুহূর্তের জন্যও উপেক্ষা করা যাবে না।
ইসলাম ন্যায়বিচার, সংযম, আমানতদারি এবং দুর্বলের অধিকার রক্ষার শিক্ষা দেয়। একজন আলেম, ইমাম কিংবা মাদ্রাসাশিক্ষকের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা তৈরি হয় তাঁর জ্ঞান, চরিত্র ও নৈতিক আচরণের কারণে। সেই পরিচয়ের আড়ালে কেউ যদি অনৈতিক আচরণ করেন, তবে তাঁর পদমর্যাদা অভিযোগের তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করার কারণ হতে পারে না। বরং যাঁর হাতে অভিভাবকেরা সন্তানকে নিরাপদে শিক্ষার জন্য সোপর্দ করেন, তাঁর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজন আরও বেড়ে যায়। এখানে সব ধর্মীয় শিক্ষককে সন্দেহের চোখে দেখার কোনো অবকাশ নেই। অসংখ্য আলেম ও শিক্ষক নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতার সঙ্গে শিশুদের শিক্ষা দিচ্ছেন। তাঁদের অবদান সম্মান ও স্বীকৃতির দাবিদার। কিন্তু ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কারও বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে হালকা করে দেখা যেমন অন্যায়, তেমনি অভিযোগের ভিত্তিতেই কাউকে চূড়ান্ত অপরাধী ঘোষণা করাও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। আইনের চোখে পোশাক, পদবি কিংবা সামাজিক প্রভাব নয়—প্রমাণ ও অপরাধের প্রকৃতিই হবে বিবেচনার ভিত্তি। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা হয় সত্যকে স্বাগত জানানোর মাধ্যমে, অভিযোগ চাপা দিয়ে নয়।
শিশুরা সব সময় নির্যাতন কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কথা সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করতে পারে না। ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ, শাস্তির আশঙ্কা কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির কর্তৃত্ব তাদের নীরব করে রাখতে পারে। কোনো শিশু হঠাৎ বিদ্যালয় বা মাদ্রাসায় যেতে না চাইলে, নির্দিষ্ট কারও কাছে যেতে ভয় পেলে কিংবা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে অভিভাবকদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এসব লক্ষণ নিজেরাই অপরাধের প্রমাণ নয়, তবে শিশুর সঙ্গে সংবেদনশীলভাবে কথা বলার এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নেওয়ার যথেষ্ট কারণ। কোনো শিশু অভিযোগ করলে তাকে দোষারোপ করা, বারবার জেরা করে মানসিক চাপে ফেলা কিংবা তার পরিবারের জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিযোগের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিশুটির বাবা আধুনিক পোশাক পরেন কি না, শরীরচর্চা করেন কি না কিংবা কতটা ধর্মীয় অনুশাসন পালন করেন—এসব প্রশ্নের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির আচরণের দায় নির্ধারণের কোনো সম্পর্ক নেই। একজন অভিভাবকের জীবনযাপনকে সামনে এনে শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া মূল সমস্যাকে আড়াল করারই নামান্তর। সন্তানকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো মানে তার নিরাপত্তার দায়িত্ব ত্যাগ করা নয়; বরং প্রতিষ্ঠানকে সেই দায়িত্ব পালনের জন্য বিশ্বাস করা।
নিজের সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত একজন বাবার ক্ষোভ ও উদ্বেগ উপলব্ধি করা কঠিন নয়। কিন্তু সেই ক্ষোভের বশে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মারধর করা কিংবা জনতার হাতে শাস্তি দেওয়াকে ন্যায়বিচারের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অভিযোগের তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পুলিশ, প্রশাসন ও আদালতের। এখানে দুটি বিষয় পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, শিশুর প্রতি কথিত অনৈতিক আচরণের অভিযোগ। দ্বিতীয়ত, ঘটনার পর মারধর, হামলা, ভাঙচুর কিংবা অন্যান্য পাল্টা অভিযোগের সত্যতা। প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ যেন অন্য অভিযোগের তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করার হাতিয়ার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। জনতার হাতে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচারকেই দুর্বল করে। আজ আবেগের বশে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা হলে, কাল অন্য কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিও একই পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন।
কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ উঠলে কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তির আচরণ নয়, প্রতিষ্ঠানের তদারকি ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষ অভিযোগ সম্পর্কে আগে থেকে কিছু জানত কি না, জানলে কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, শিশুটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল কি না এবং তদন্তে সহযোগিতা করছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর থাকা জরুরি। অভিযোগ জেনেও তা উপেক্ষা করা, ভুক্তভোগীকে চুপ থাকতে চাপ দেওয়া কিংবা তদন্তে বাধা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও আইন অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার লিখিত নীতিমালা, অভিযোগ গ্রহণের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা, শিক্ষক-কর্মচারীদের আচরণবিধি এবং দায়িত্বশীল তদারকি থাকা অত্যন্ত জরুরি। অভিযোগ উঠলে শিশুর নিরাপত্তার স্বার্থে আইনসম্মত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে এবং প্রয়োজনে নিরাপদ পরিবেশে নজরদারি ও প্রশিক্ষিত অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য শক্তিশালী আইনগত কাঠামো রয়েছে। শিশু আইন, ২০১৩-সহ প্রাসঙ্গিক আইন ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে বিচার পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে শিশুর মর্যাদা এবং মানসিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিশুকে যেন একই ঘটনা বারবার বলতে বাধ্য করা না হয় এবং তার পরিচয় যেন প্রকাশ না পায়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা কাম্য। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দেরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মসজিদ, মাদ্রাসা ও সামাজিক পরিসরে তাঁদের স্পষ্টভাবে বলতে হবে—শিশুর প্রতি যৌন হয়রানি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, ধর্মীয় পরিচয় কাউকে দায়মুক্তি দেয় না এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিচার শেষ হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্ত অপরাধী ঘোষণা করা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বও হলো যাচাইহীন তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকা এবং শিশুর পরিচয় গোপন রাখা।
সবশেষে বলতে হয়, একটি শিশুর নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কের চেয়ে বড়। অভিযুক্ত ব্যক্তি শিক্ষক, আলেম, কর্মকর্তা কিংবা সাধারণ নাগরিক—যেই হোন না কেন, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হতে হবে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে ন্যায়সংগত অধিকার রক্ষা করতে হবে। আমাদের দাবি কোনো ব্যক্তির প্রতি প্রতিশোধ নয়; আমাদের দাবি শিশুর নিরাপত্তা, সত্য উদ্‌ঘাটন এবং ন্যায়বিচার। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করতে হলে সবার আগে রক্ষা করতে হবে সেই প্রতিষ্ঠানে পড়তে আসা কোমলমতি শিশুদের। যে সমাজ তার সবচেয়ে অসহায় সদস্যটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, সে সমাজের নৈতিকতার দাবি যতই উচ্চকণ্ঠ হোক না কেন, তার ভিত ততটাই দুর্বল। শিশুর সুরক্ষায় আপস নয়, অপরাধের বিচারে পক্ষপাত নয়, আর ন্যায়বিচারের নামে জনতার শাস্তিও নয়—এই তিন নীতিই হোক আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অঙ্গীকার।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com

আজকের সর্বশেষ সবখবর
  • আপনার এলাকার খবর খুঁজুন

    খুঁজুন
  • Website Design & Development by BD IT HOST ↗