
ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল বেশি থাকায় তা খেলে হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে, এমন ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। এ কারণে অনেকেই ডিমের সাদা অংশ খেলেও হলুদ অংশ ফেলে দেন। কিন্তু ডিমের কুসুম কি সত্যিই হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর, নাকি এই প্রচলিত ধারণার পেছনে রয়েছে ভুল তথ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমের কুসুম শুধু কোলেস্টেরলের উৎস নয়, বরং শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বহু পুষ্টি উপাদানে ভরপুর। তাই সুস্থ মানুষের খাদ্যতালিকা থেকে অকারণে ডিমের কুসুম বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সম্প্রতি বিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে ডায়েটারি কনসালট্যান্ট ডা. অরুণ কুমার ডিমের পুষ্টিগুণ, কুসুম খাওয়ার উপকারিতা এবং হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ে প্রচলিত নানা ধারণার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ডিমের কুসুমে যে পুষ্টি রয়েছে একটি ডিমে সাধারণত প্রায় ৬০ ক্যালরি এবং ছয় গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন থাকে। ডিমের প্রোটিন সহজে হজম হয় এবং শরীরে দ্রুত শোষিত হয় বলে পুষ্টিবিজ্ঞানে একে উৎকৃষ্ট মানের প্রোটিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ডিমের সাদা অংশের পাশাপাশি কুসুমেও প্রোটিন রয়েছে। এছাড়া কুসুমে রয়েছে কোলিন, ভিটামিন ডি, ফোলেট, আয়োডিন, বি-ভিটামিন, লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন। বিশেষ করে কোলিন স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশেও এই পুষ্টি উপাদানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। একটি ডিমের কুসুমে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে। এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে ডিমের কুসুম খাওয়া নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। তবে খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল এবং রক্তে থাকা কোলেস্টেরল এক বিষয় নয়। শরীরের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের বড় অংশ যকৃত নিজেই তৈরি করে। খাবার থেকে কোলেস্টেরল গ্রহণ বাড়লে অনেক ক্ষেত্রে যকৃত নিজের উৎপাদন কমিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখে। ডা. অরুণ কুমারের মতে, অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে ডিম থেকে পাওয়া কোলেস্টেরল রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় না। এ কারণে ডিমের কুসুম খাওয়ার বিষয়ে আগের মতো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয় না। তবে রক্তে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে ধমনিতে চর্বি জমে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। এতে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষজ্ঞের মতে, অধিকাংশ সুস্থ মানুষ পরিমিত পরিমাণে ডিমের কুসুম খেতে পারেন। তবে যাদের বংশগত কারণে কোলেস্টেরল প্রক্রিয়াজাত করার সমস্যা রয়েছে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ডিম খাওয়া উচিত। দিনে কয়টি ডিম খাওয়া নিরাপদ ডিম খাওয়ার পরিমাণ নির্ভর করে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী, শিশুদের প্রতিদিন এক থেকে দুটি ডিম দেওয়া যেতে পারে। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্করা সাধারণত দিনে একটি থেকে দুটি ডিম খেতে পারেন। গর্ভবতী নারীরা দিনে সর্বোচ্চ দুটি ডিম খেতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন এবং বাড়তি প্রোটিনের প্রয়োজন রয়েছে, এমন ব্যক্তিরা দৈনিক তিন থেকে চারটি ডিম খেতে পারেন। তবে হৃদরোগ, উচ্চ কোলেস্টেরল বা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে ব্যক্তিভেদে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা জরুরি। দেশি না ফার্মের ডিম, কোনটি বেশি পুষ্টিকর দেশি বা উন্মুক্ত পরিবেশে পালিত মুরগির ডিমকে অনেকেই বেশি পুষ্টিকর মনে করেন। তবে বিশেষজ্ঞের মতে, দেশি ও পোল্ট্রি ফার্মের ডিমে প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় একই। মুরগির খাদ্যাভ্যাসের কারণে ডিমের কুসুমের রং ও কিছু পুষ্টি উপাদানে পার্থক্য হতে পারে। প্রাকৃতিক খাবার খাওয়া মুরগির ডিমে ক্যারোটিনয়েড এবং ওমেগা-৩ কিছুটা বেশি থাকতে পারে। মুরগিকে কি হরমোন দেওয়া হয় ব্রয়লার মুরগি বা ডিম উৎপাদনকারী মুরগিকে দ্রুত বড় করার জন্য হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়, এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে। তবে ডা. অরুণ কুমারের মতে, বাণিজ্যিকভাবে মুরগি পালনে হরমোন ব্যবহার বাস্তবসম্মত নয়। মুরগির রোগ প্রতিরোধের জন্য দেওয়া টিকাকে অনেক সময় হরমোন ইনজেকশন বলে ভুল করা হয়। এছাড়া ডিম বা মুরগির মাংস খাওয়ার কারণে মেয়েদের বয়ঃসন্ধি আগে শুরু হয়, এমন দাবির পক্ষেও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কাঁচা ডিম খাওয়া কতটা নিরাপদ পুষ্টির জন্য অনেকে কাঁচা ডিম খেয়ে থাকেন। তবে বিশেষজ্ঞরা কাঁচা ডিম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। কাঁচা ডিমে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া থাকার আশঙ্কা থাকে। এটি থেকে ডায়রিয়া, বমি ও খাদ্যবাহিত সংক্রমণ হতে পারে। এছাড়া কাঁচা ডিমের সাদা অংশে থাকা অ্যাভিডিন বায়োটিন শোষণে বাধা দিতে পারে। নিয়মিত বেশি পরিমাণে কাঁচা ডিম খেলে বায়োটিনের ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই ডিম ভালোভাবে রান্না করে খাওয়াই নিরাপদ। সব মিলিয়ে ডিমকে অকারণে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। এটি প্রোটিন ও গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্য উৎস। তবে সুস্থ থাকতে, হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে ডিমের পাশাপাশি সামগ্রিক খাদ্যতালিকা ও জীবনযাপনের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।


