আবু সুফিয়ান বাবু,
ইসলামে জুমার দিন মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। সপ্তাহের এই বিশেষ দিনে জুমার নামাজ আদায়, পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, কোরআন তিলাওয়াত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ এবং বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কোরআন ও হাদিসে জুমার দিনের বিভিন্ন আমল ও ফজিলত সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পবিত্র কোরআনের সুরা আল-জুমআর ৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে নামাজের জন্য আহ্বান করা হলে তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও।’ (সুরা আল-জুমআ, আয়াত: ৯)
ইসলামি নির্দেশনা ও নির্ভরযোগ্য হাদিসের আলোকে জুমার দিনের ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত ও আমল নিচে তুলে ধরা হলো।
১. জুমার নামাজের আগে গোসল করা
জুমার নামাজের আগে গোসল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত। পরিচ্ছন্ন অবস্থায় মসজিদে যাওয়া ইসলামের সৌন্দর্য ও শিষ্টাচারের অংশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ জুমার নামাজে এলে সে যেন গোসল করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৭৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৪৪)
২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও উত্তম পোশাক পরা
জুমার নামাজে যাওয়ার সময় পরিষ্কার পোশাক পরা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সুন্দরভাবে প্রস্তুত হওয়া উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আদমসন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সুন্দর পোশাক গ্রহণ করো।’ (সুরা আল-আ'রাফ, আয়াত: ৩১)
৩. সুগন্ধি ব্যবহার করা
পুরুষদের জন্য জুমার নামাজে যাওয়ার আগে সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নাতসম্মত আমল। তবে এমন সুগন্ধি ব্যবহার করা উচিত, যাতে অন্য মুসল্লিদের কষ্ট না হয়। জুমার দিনের প্রস্তুতি সম্পর্কে সহিহ হাদিসে গোসল, পরিচ্ছন্নতা ও সুগন্ধি ব্যবহারের কথা এসেছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৩)
৪. ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
নখ ও শরীরের পরিচ্ছন্নতার যত্ন নেওয়া, দুর্গন্ধ দূর করা এবং পোশাক পরিষ্কার রাখা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বিশেষ করে মসজিদে যাওয়ার সময় এমনভাবে প্রস্তুত হওয়া উচিত, যাতে অন্য মুসল্লিরা কষ্ট না পান।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩)
৫. আগেভাগে মসজিদে যাওয়া
জুমার নামাজের জন্য আগে আগে মসজিদে যাওয়ার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, জুমার দিন যে ব্যক্তি প্রথম দিকে মসজিদে যায়, সে যেন একটি উট কোরবানি করার সমপরিমাণ সওয়াবের অধিকারী হয়; পরবর্তী সময়ে গেলে সওয়াবের স্তরও পর্যায়ক্রমে কমে আসে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮১; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫০)
৬. কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির করা
জুমার দিনসহ প্রতিটি দিনেই কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকির করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। নামাজের আগে ও পরে অবসর সময়ে কোরআন পড়া, তাসবিহ পাঠ করা এবং আল্লাহর স্মরণে সময় কাটানো যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা আর-রা'দ, আয়াত: ২৮)
৭. সুরা কাহফ তিলাওয়াত করা
জুমার দিনে সুরা কাহফ তিলাওয়াতের ফজিলত সম্পর্কে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুমার দিনে সুরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় নূর আলোকিত করা হবে। (আল-মুস্তাদরাক লিল-হাকিম, ২/৩৯৯; আল-বাইহাকি, শুআবুল ঈমান)
এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসের সনদ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুহাদ্দিসদের আলোচনা রয়েছে। তাই আমলটি ফজিলতপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও হাদিসের মান সম্পর্কে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
৮. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা
জুমার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। সুতরাং এ দিনে তোমরা আমার প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ১০৪৭; সুনান আন-নাসাঈ, হাদিস: ১৩৭৪)
৯. মসজিদে নফল নামাজ আদায় করা
মসজিদে পৌঁছে খুতবা শুরু হওয়ার আগে সুযোগ অনুযায়ী নফল নামাজ আদায় করা যায়। তবে খুতবা শুরু হলে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা জরুরি। দেরিতে এসে মুসল্লিদের ডিঙিয়ে সামনে যাওয়াও উচিত নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, এরপর মসজিদে এসে নির্ধারিত নামাজ আদায় করে এবং ইমামের খুতবা শেষ হওয়া পর্যন্ত নীরব থাকে, তার জন্য বিশেষ ক্ষমার সুসংবাদ রয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯১০)
১০. খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা
ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় নীরব থাকা এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা জুমার গুরুত্বপূর্ণ আদব। কথা বলা, মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকা কিংবা অন্যের মনোযোগ নষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিন ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় তুমি যদি তোমার সঙ্গীকে বলো, “চুপ করো”, তাহলেও তুমি অনর্থক কথা বললে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫১)
১১. বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা
জুমার দিনে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া, নিজের ও পরিবারের কল্যাণ কামনা করা এবং দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গলের জন্য দোয়া করা উচিত। হাদিসে জুমার দিনে দোয়া কবুলের একটি বিশেষ সময়ের কথা বলা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, কোনো মুসলিম বান্দা সে সময়ে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৫২)
এই বিশেষ সময়টি কখন, তা নিয়ে আলেমদের মধ্যে একাধিক মত রয়েছে। অনেক আলেম আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের আগের সময়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
১২. যথাসময়ে জুমার নামাজ আদায় করা
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ, মুকিম ও শরিয়ত অনুযায়ী যাদের ওপর জুমা ফরজ, তাদের জন্য জামাতে জুমার নামাজ আদায় করা আবশ্যক। শরিয়তসম্মত ওজর ছাড়া জুমার নামাজ ত্যাগ করা গুরুতর বিষয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে নামাজের জন্য আহ্বান করা হলে তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও।’ (সুরা আল-জুমআ, আয়াত: ৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ যেন জুমা ত্যাগ করা থেকে বিরত থাকে; অন্যথায় আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮৬৫)
জুমার দিনে আরও যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখা জরুরি
দোয়ার বিশেষ সময় কাজে লাগানো: জুমার দিনে বেশি বেশি দোয়া করা এবং বিশেষ করে আসরের পর থেকে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত সময়কে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
অন্য মুসল্লিকে কষ্ট না দেওয়া: কাউকে ডিঙিয়ে সামনে যাওয়া, ধাক্কাধাক্কি করা, উচ্চস্বরে কথা বলা কিংবা দুর্গন্ধযুক্ত অবস্থায় মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
খুতবার সময় নীরব থাকা: খুতবা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও মোবাইল ফোনের ব্যবহার পরিহার করতে হবে।
নামাজের পর আল্লাহর জিকির করা: জুমার নামাজ শেষে আল্লাহর স্মরণে সময় কাটানো এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নেক আমল অব্যাহত রাখা উচিত।
উপসংহার
জুমার দিন শুধু সাপ্তাহিক জামাতের দিন নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, ইবাদত, দোয়া ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কোরআন ও সহিহ হাদিসের নির্দেশনা অনুসরণ করে জুমার দিনের সুন্নাত ও নেক আমলগুলো পালনের মাধ্যমে একজন মুসলিম নিজের জীবনকে আরও সুন্দর ও আল্লাহমুখী করে তুলতে পারেন।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন; সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম; সুনান আবু দাউদ; সুনান আন-নাসাঈ; আল-মুস্তাদরাক লিল-হাকিম; শুআবুল ঈমান।